<

বকুল দেব's Posts (24)

নেই সে শরত!

নেই সে শরত!

       বকুল দেব 

আজ নেই সেই নীলাকাশ,

চরে চরে নেই শুভ্র কাশ ,

     শিউলীর নেই ছড়াছড়ি ।

শিশিরে ভেজে না মন!

শরত  ছিলো না এমন ,

    আকাশে  মেঘের উড়াউড়ি।

শরতে ছিলো স্নীগ্ধ মন

হৃদয়ে জাগতো শিহরন,

   আনন্দে মেতে উঠতাম সবি।

নতুন পোষাক পরিচ্ছদ

খাবার দাবার নানা পদ,

   মনেতে ভাসে সেই সব ছবি।

আজ মেঘ ভরা আকাশে

শরত থাকে ফ্যাকাশে ,

এভাবেই কাটে পুজোর ক’টা দিন

ফেইস বুকে হয় কুলাকুলি,

ওয়াটস আপে বলাবলি,

শারদ সংখ্যা খোজ করি না,সবি প্রাণহীন ।   

     

Read more…

সে তুমি , আমার বাবা

অনেক অনেকদিন হলো তোমায় হারিয়েছি,

প্রায় প্রতিনিয়তই, মনে মনে তোমায় মনে করেছি ,

তোমার অবিকল ছবি একেঁছি মনে মনে ।

তোমার চেহারা, আমার মনে ,

আমার চোখে , আমার মানসপঠে 

আজোও একটুও ঝাপসা হয়নি।

সে তুমি , আমার বাবা ।

Read more…

অনেক অনেকদিন হলো তোমায় হারিয়েছি,

প্রায়  প্রতিনিয়তই, মনে মনে তোমায় মনে করেছি ,

তোমার অবিকল ছবি একেঁছি মনে মনে ।

তোমার চেহারা, আমার মনে ,

আমার চোখে , আমার মানসপঠে 

আজোও একটুও ঝাপসা হয়নি।

সে তুমি , আমার বাবা ।

Read more…

জীবনের শেষাশেষি

বকুল দেব 

এই সেদিন আমি ক্ষণিক আনমনে  

নিজের এক কালের অজ পাঁড়া গায়েঁ

অতি ভোরে একাকি নিঃসঙ্গ হাঁটতে থাকি।

আমি বড্ড-চেনা অতচ সন্ধিগ্ধ পথে হেঁটে গিয়ে

কুঁড়ে ঘরের বদলে সারি সারি ছোট বড় ইমারত দেখি,

ছনের বদলে সিলভার ঢেউ টিনের ছাউনি দেখি,

শষ্য ক্ষেত পুকুরগুলো ভরাট করে

তৈরি করা ঘিঞ্জি মানব বসতি দেখি।

নক্ষত্রহীন আকাশ দেখি।

দেখি আর ভাবি , এ কি আমার নস্টালজিয়া  

আবিষ্কার করি, এ আমার বড্ড চেনা পথ  

আসলে এ আমারই ভালোবেসে ফেলা আকাশ।

আমি নিজেই বদলে গেছি।

তাই বড্ড অচেনা মনে হয় এই গ্রাম ,

 এই আকাশ, এই জীবন।

গ্রামের  নিস্তব্ধতা ও উপেক্ষা আমাকে তীরবিদ্ধ করে যায়।

জীবনের শেষাশেষি প্রায়, 

আকাশ বাতাস মথিত করে ,

চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে,

প্রিয় জীবন, প্রিয় গ্রাম,

আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম।

 

Read more…

অস্থির

     

বালির পাহাড়ে দাঁড়িয়ে

সমুদ্রের ঢেউ দেখা,

মাটির স্লেটের উপর

চক দিয়ে লেখা। 

স্থায়ী নয় স্থির নয়,

   কোনোটাই ।

অস্থির আমাদের

    জীবনটাই 

Read more…

অস্থির

     

বালির পাহাড়ে দাঁড়িয়ে

সমুদ্রের ঢেউ দেখা,

মাটির স্লেটের উপর

চক দিয়ে লেখা। 

স্থায়ী নয় স্থির নয়,

   কোনোটাই ।

অস্থির আমাদের

    জীবনটাই 

Read more…

অনুভব

অনুভব করি, 

আমার স্মৃতি বইয়ের পৃষ্ঠা গুলোতে

ততোদিনে অনেক জায়গায় অস্পষ্টতার রেশ বড্ড তীব্র।

আমার মনে পড়ে যায়, এই গ্রামে আমি প্রথম সাইকেলে চড়তে শিখেছিলাম,

বন্ধুর সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম পথের মোড়ে।

এন্টিবায়োটিক গিলতাম অনেকদিন।

নির্বিকার ধূলোমাখা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দেয়,

এইগ্রামে আমি সিগ্রেট মুখে দিয়ে ভেবেছিলাম,

প্রশান্তি ছেয়ে আছে আমার দিগ দিগন্তে।

প্রথম প্রেমপত্র পেয়েছিলাম কারও কাছে।

লিখেছিলামও দু’য়েকটা। 

Read more…

অনুভব

অনুভব করি, 

আমার স্মৃতি বইয়ের পৃষ্ঠা গুলোতে

ততোদিনে অনেক জায়গায় অস্পষ্টতার রেশ বড্ড তীব্র।

আমার মনে পড়ে যায়, এই গ্রামে আমি প্রথম সাইকেলে চড়তে শিখেছিলাম,

বন্ধুর সাইকেলের ক্যারিয়ার থেকে মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম পথের মোড়ে।

এন্টিবায়োটিক গিলতাম অনেকদিন।

নির্বিকার ধূলোমাখা বাতাস আমাকে মনে করিয়ে দেয়,

এইগ্রামে আমি সিগ্রেট মুখে দিয়ে ভেবেছিলাম,

প্রশান্তি ছেয়ে আছে আমার দিগ দিগন্তে।

প্রথম প্রেমপত্র পেয়েছিলাম কারও কাছে।

লিখেছিলামও দু’য়েকটা। 

Read more…

আমি আজ এক অনুৎপাদক বিকল ক্যালকুলেটর,

বহু পুরানো, এক সময়ের বন্ধু তোমার

আমাকে যথেচ্ছ ব্যবহারের পর , 

বহু হিসেব মেলানোর পর, আমাকে করেছো অথর্ব ।

তোমার হাতের আঙ্গুলে,

শায়িত শরীরের বিন্যাস করা প্রতিটি অক্ষর ক্ষত বিক্ষত ।

আমি অবিকল আছি  অথচ বিকল ।

আজ যন্ত্রণায় অযতনে নির্ব্বাক, পরিত্যক্ত আশ্রয়ে ।

 

 

Read more…

আমি আজ এক অনুৎপাদক বিকল ক্যালকুলেটর,

বহু পুরানো, এক সময়ের বন্ধু তোমার

আমাকে যথেচ্ছ ব্যবহারের পর , 

বহু হিসেব মেলানোর পর, আমাকে করেছো অথর্ব ।

তোমার হাতের আঙ্গুলে,

শায়িত শরীরের বিন্যাস করা প্রতিটি অক্ষর ক্ষত বিক্ষত ।

আমি অবিকল আছি  অথচ বিকল ।

আজ যন্ত্রণায় অযতনে নির্ব্বাক, পরিত্যক্ত আশ্রয়ে ।

 

 

Read more…

আমি আজ এক অনুৎপাদক বিকল ক্যালকুলেটর,

বহু পুরানো, এক সময়ের বন্ধু তোমার

আমাকে যথেচ্ছ ব্যবহারের পর , 

বহু হিসেব মেলানোর পর, আমাকে করেছো অথর্ব ।

তোমার হাতের আঙ্গুলে,

শায়িত শরীরের বিন্যাস করা প্রতিটি অক্ষর ক্ষত বিক্ষত ।

আমি অবিকল আছি  অথচ বিকল ।

আজ যন্ত্রণায় অযতনে নির্ব্বাক, পরিত্যক্ত আশ্রয়ে ।

 

 

Read more…

আজ যদি তোমাকে দিই 
কিছু ফুল কিছু কবিতা 
নেবে না ফিরিয়ে দেবে এই বলে 
ফুল তো রাত পোয়ালেই বাসি 
আর আমার কবিতায় নাকি আনন্দ কম 
বিষাদ রাশি রাশি। 
তবে যদি তোমাকে দিই 
জড়োয়া গয়না-জমকালো শাড়ি 
নেবে না ফিরিয়ে দেবে এই বলে 
একদিন তো বিবর্ন হবে শাড়ি 
আর বয়সকালে গয়না লাগবে ভারি। 
তবে তোমাকে কি দিই তুমিই বল 
তুমি বললে মুচকি হেসে 
যা দিয়ে এসেছ এতদিন তাই- 
ভালোবাসা ।

 

Read more…

জীবনটা

ব্যস্ত মোর জীবনটা

    ওটা নামা করছে

চঞ্চল মনটা যে
  বন বন ঘুরছে ।

আকাশে নানা রঙ্গে

  ঘুড়ি দেখো উড়ছে

নীল দিগন্তে মনটা

  বিরামহীন ছুটছে ।

যে যেভাবে ভাবো

  সংসারটা তা’ই ,

জীবনটা শেষ হলে

রয়ে যাবে ছাঁই ।

 

 

Read more…

          রোমন্থনে কষ্ট বাড়ে

                       

                 

                ‘‘  পুরানো সেই দিনের কথা
                    ভুলবি কিরে হায়
                    ও সেই চোখের দেখা
                    প্রাণের কথা সে কি ভোলা যায়..”

 

খুব ছোটো বেলার কথা মনে পড়ে, তখন জীবন অনেক সহজ ছিল , সবকিছু ছিল , সবাই ছিল , হাসি ছিল, আনন্দ ছিল ।
''দাঁড়ায়ে-দাঁড়ায়ে সব দেখেছি যে,-মনে হয় যেন সেই দিন!''

  • এখন জীবন অনেক কঠিন , অনেক জটিল , সবকিছু কেমন জানি নিস্প্রাণ , আমিও আনন্দ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এখন সাদা-কালো ।
    তবুও সময় গড়ায় , সকালটা শেষ হয় , প্রতিদিন , একইভাবে । আমি বুঝি সময় চলে যাচ্ছে , কিন্তু কিছু করার নেই আর , এখন আর কিছু গড়ার নেই নতুন করে ,মনের মতো করে ভাবারও নেই ।

 পুরানো দিনের কথা মনে হলেই নিজের অজান্তেই স্মৃতিরা উঁকি দেয় মনের অলিতে গলিতে,

মনটা হারিয়ে যায় সেই সোনালী অতীতে। ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে মন, হারিয়ে যাওয়ার বেদনায় । ইট কাঠ পাথরে ঠাসা এই শহর ছেঁড়ে  মনটা চলে যায় সেই চির চেনা গ্রামীন সম্রাজ্যে, আর আমি নস্টালজিক হয়ে যাই। ছবির মত সুন্দর বলতে যা বোঝায় ঠিক সে রকম সবুজ বনানী ঘেরা শষ্য শ্যামলা একটি গ্রামে আমার কেটেছে ছেলেবেলাটা 

                     বাবা মা ভাই বোনদের নিয়ে  সুখে দুঃখে মিলে মিশে থাকা এ এক ভালো লাগার যার পর নাই সুখানুভূতি । গাঁয়ের ধুলো মাটি মেখে বড় হয়ে ওঠা গ্রাম্য সংস্কৃতির সকল উপভোগ্য  আচার অনুষ্টানে ছোট্ট ছোট্ট ছেলে মেয়েদের সাথে একত্রিত হয়ে মন উজাড় করা হৈ চৈ এর মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠা মন প্রাণ আজ স্মৃতির রোমন্থনে চনমন করে ।  সেই সব  বন্ধুরা আজ আর ধারে কাছে নেই । যার যার কাজে নিজেরা আত্মকেন্দ্রীক হয়ে অনেকেই সংসারে নিমগ্ন চলতে চলতে কারো কারো সাথে কখনো বা দেখা হয় , সামান্য কুশল বিনিময় ছাড়া স্মৃতি নিয়ে তেমন নাড়াছাড়া হয় না ।

কেনো বয়স  বাড়লে ছোট্টো বেলার বন্ধুরা হারিয়ে যায় ? কেন হারিয়ে যায় সব, বেড়ে যায় ভীড় , হারানোর তালিকায় ? কিছু কিছু শুন্যতা, কখনো পূরণ হয় না.....কিছু চাওয়া পাওয়া , সব সময় অপূর্ণই থেকে যায়.....আর কিছু অনাকাঙ্খিত স্বপ্ন, নীরবে ফেলে হতাশার দীর্ঘশ্বাস...হায় জীবন,হায় সংসার! 

গোটা গ্রামের  মাঝখান দিয়ে বহে গেছে একটি ছড়া , এখন দেখতে অনেকটা নদীর মতোতার দুই তীরে গ্রাম্য জনপদ । বলতে গেলে সবাই কৃষক । গ্রামের  নাম মাছলী ছড়া ছড়া নামক নদীটা সর্পিল গতিতে এঁকেবেঁকে গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে গেছে। জোৎস্না রাতে নদীর জলে যখন চাঁদের আলো পড়ত, অদ্ভুত মায়াময় এক পরিবেশ তৈরি হত। কৈশোরের সেই স্মৃতি আমার মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, আজও তাই শহুরে জোৎস্না দেখলেই  মনটা চলে যায় সেই স্মৃতি বিজড়িত নদীর পাড়ে। 

ভরা বরষায় চারিদিক বন্যার জলে  থৈ থৈ করত। ফসলি জমি সব তলিয়ে যেত, চারিদিকে 
শাপলা শালুকের মেলা বসতো। বন্ধুরা মিলে কলা গাছের ভেলা বানিয়ে চলে যেতাম দূরে, বহু দূরে। কত যে জোঁকের কামড় খেয়েছি তাঁর হিসেব নেই । আহা! কি চমৎকার দিন ছিল সে সব ! দুরন্ত, বাঁধন হারা। 
ঘরের চালে ঝুম ঝুম বৃষ্টির শব্দ অপূর্ব সুরের মূর্ছনা তুলত। এইসব ছোট ছোট স্মৃতিগুলো মনের কোণে হানা দেয় যখন তখন। আমাদের পূবের টীলায় গগনচুম্বী একটা কদম গাছ ছিলো ।গাছটায় কি সুন্দর হলুদ ফুল ফুটত ! থোকা থোকা !  কদম গাছটির নীচে ভৈরব তলী । তার সাথেই একটি শেওড়া গাছ সেখানে রূপসী পূজা হতো ।  মানত করে মা ভৈরবকেও পূজো দিতেন । এখন তেমন একটা পূজো টুজো হয় না ।


বৃষ্টিতে ভেজা ছিল দৈনন্দিন ব্যাপার, ঘরের চালে টুপ টাপ আম পড়লেই হল, দে 
ছুট ! এক ছূটে আমতলায়, ভাই বোনদের সাথে কাড়াকাড়ি করে কখনো ভাগাভাগি করে 
খাওয়ার আনন্দটা আজও মনে ভাসে।  প্রচুর কাঁঠাল গাছ ছিল বাগানে ।  বিভিন্ন নামের বিভিন্ন জাতের ।  তখন কাঠাঁল প্রিয় ছিলাম । আমার এক ভাই ( অনিল)  কাঠাঁল গাছে বসে বসেই কাঠাঁল খেতো । স্কুল ছুটির পর দল বেধেঁ চুরি করে লুকলুকি ঠেকুরই খেতাম , কত না শিহরন কত না মজা হত , বুঝানোর ভাষা নেই ।  রাত হলে ব্যাঙ ডাকা কিংবা ঝিঁঝিঁ পোকার 
একটানা শব্দ মনে অপূর্ব সুরের আবেশ জাগাত- এসব এখন কেবলি অতীত। মনে মনে ভাবি ইস! যদি আবার ফিরে পেতাম মনের মধ্যে সযত্নে লালিত সোনা ঝড়া দিনগুলি আমার ! রবি ঠাকুরের গান তাই তো আজ জীবনের এক অবিচ্ছ্যেদ্য অংশ, কখন যে নিজের মনে গেয়ে উঠি - দিন গুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না, সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি...

শীতের সকালে কুয়াশায় ঢাকা গ্রামটাকে অচেনা লাগতো। শিশির মাখা দূর্বা ঘাসের 
উপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার আমেজটাই ছিল অন্যরকম! ঝোপের পাশে ফুটে 
থাকত থোকা থোকা লজ্জাবতী ফুল, একটু ছুঁয়ে দিলেই নব বধূর মত লজ্জায় নিজেকে 
গুটিয়ে নিত। রাস্তার পাশে ফুটে থাকা নানা রকম ঘাস ফুল কিংবা স্বর্ণলতা - এর
সবই এখনো আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকে। শীতের সময় আখের রস ছিল অন্যতম 
আকর্ষণ। নদীর পাড়ে আমাদের আখ ক্ষেত । নদীতে স্নানের আগে একটার পর একটা আখ ক্ষেতে বসে বসেই ভেঙ্গে ভেঙ্গে খেতাম। আখের রসের পায়েসের  স্বাদ কতকাল পাইনা ! 



চামকাঠাঁল গাছে ঝুলন্ত বাবুই পাখির বাসার নিখুঁত শিল্পায়ন আমাকে বিমোহিত করে 
রাখতো। কতদিন আম গাছের ডাল থেকে পাখির ছানা পেড়ে আনতে গিয়ে বাবার বকুনি 
খেয়েছি ! একদিন তো পাখির কামড় খেয়ে হাতের অনেকটা কেটেই গেল, সেই স্মৃতি 
চিহ্নে যখনি হাত বুলাই অন্য রকম অনুভূতি হয়। এ রকম কত স্মৃতি আসে মনে ! 
বাড়ীর নীচে ছড়ার পারে  শিমুলের গাছ দেখে মনে হত যেন আগুন লেগেছ। 
টকটকে লাল ফুলে ফুলে ছেয়ে যেত সারা গাছ। 

পৌষ পার্বনে নদীর চরে পিকনিক ছিল আমাদের প্রতি বছরের বিনোদন।  এ সবই এখন শুধুই অতীত। আজ ক্ষণে ক্ষণে মন চলে যায় নদীর সেই ধু ধু বালু চরে, যেখানে ছিল সাদা সাদা বকের ঝাঁক আর বালি হাঁসদের নিত্য আনাগোনা। 

গাঁয়ে বৈশাখ আসতো নতুন বারতা নিয়ে, চৈতী  মেলা তথা চড়ক মেলার নানা আয়োজনে মত্ত থাকত গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা । দূর দূরান্ত থেকে দোকানীরা আসতো রকমারি খাবারের
পসরা নিয়ে, শিশু কিশোরদের জন্য খেলনা আর থাকত আকর্ষণীয় সব খেলা আরও কত কি ! 

আমাদের বাড়ির অদূরে বহু বছরের পুরনো বিশাল ভুবি গাছটা আজ আর নেই, ওই গাছটাকে ঘিরে  কত স্মৃতি ! গাছতলাটাই ছিল আমাদের হেড কোয়ার্টার, যতসবদুষ্টুমির প্ল্যান হত ওইখানেই। কি গাছ ছিল না সেখানে! আম, জামডেউয়া, আমড়া, পেয়ারা, সফেদা,ভুবি,লুকলুকি ইত্যাদি আরও কত কি ! লুকিয়ে গাছে উঠে লুকলুকি খেতে গিয়ে কতদিন যে ‘ঝাড়ুর মার’ তাড়া খেয়েছি , তার ইয়ত্তা নেই ! 

সারাদিন শেষে সন্ধ্যা নামে। বাঁশ বনে পাখ-পাখালীর যেন হাট বসে, নানা রকম  পাখীদের কিঁচির মিঁচির শব্দে কান ঝালা পালা হয়ে যেত। বয়স্করা বিরক্ত হলেও আমি যেন এই ক্ষণটির অপেক্ষায় থাকতাম। আঁধার নামলে জোনাকিরা ভিড় জমাতোতাদের মিটি মিটি আলোয় নিঃস্তব্দ আঁধারে প্রানের সঞ্চার হত। ভেসে আসতো শেফালী ফুলের মাতাল করা গন্ধ। 


সময় বদলের সাথে প্রকৃতি তার রং বদলায়, বদলাতে চায় তার কিছু রীতিনীতি কিন্তু অমোঘ বিধানের নিয়মে বাঁধা পড়ে সে।  নিষ্ঠুর সময় অবাধ্য প্রকৃতির অনেক কিছুই পাল্টাতে পারেনি। গতিময় স্রোত আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ঠিকই কিন্তু এই গতিময়তা তার ব্যাখ্যা সেখানে নেয়। এইরকম অনুভূতিহীন গতিময় কিছু অস্থিরতা সবসময় আমাকে যন্ত্রনা দেয় ,মনটাকে পোড়ায়। নিজে থেকে পুড়ে তো আর খাঁটি হওয়া যায়না , তা কেবল খাঁটি হলেই বোঝা যায়, ‘আমি অনেক পুড়েছি’।

সেই মাছলী আর আর মাছলীতে নেই । যা যা ছিলো তার অনেক কিছুই আজ আর নেই । যা যা ছিলো না  আজ প্রায় সবই হাতের নাগালে । সময়ের আবর্তনে প্রয়োজনের আকাঙ্ক্ষায় পরিবেশ পরিস্তিতি জীবন মান সবই উন্নততর । তাই অতীতকেও যেমন ধরে রাখা যায় না আবার  বর্তমানকেও ঠেলে দেওয়া যায় না । ভাবি আর ভাবি , কেন ছিটকে গেলাম স্বপ্নে ঘেরা আমার প্রিয় গ্রাম থেকে । আমি নিজেই বা তার জন্য কতটুকু দায়ী ! যে মাটি প্রথম স্পর্শ করেছিলাম , যে জলে প্রথম আবাহন করেছিলাম , আলো বাতাস পেয়ে পুলকিত হয়ছিলাম , যেখানে আমার প্রথম প্রেম ভালবাসা , সেখানে আজ আর আমি নেই , সবই বিস্মৃতি । ভাবি আর ভাবি । এভাবে কান্না হচ্ছে  আমার তপ্ত শ্বাসের শেষ পর্যায়ের সান্ত্বনা।

ঝড় তো আর কম গেলো না এই  সীমাবদ্ব জীবনে । পঠন পাঠনের সামান্য স্কুল জীবন শেষ করে ,আর্থিক অনটনের মধ্যেই নেমে পড়লাম খোলা রাজনীতির ময়দানে। সে সামান্য কটা দিন মাত্র । পরিবারে তখন আমরা ভাই বোন মা বাবা মিলে ৯ জন। সামান্য ক্ষেত কৃষি , বাবা আর ছোট ভাইয়ের কায়িক শ্রম আর আমার সামান্য ক’টা টিউশনির টাকা,মাঝে মধ্যে চড়া সুদে ধার ,এই চলতে থাকে সংসার। তদানীন্তন পাকিস্থান থেকে ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে আসা কপর্দকহীন বাবা মা আমাদেরকে সীমাহীন পরিশ্রম করে অফুরন্ত আর্থিক অসচ্ছলতার মধ্য দিয়ে বড় করে তুলে ছিলেন । যোগ্যতায় তো আর সব সময় কাজ পাওয়া যায় না । আমার তেমন যোগ্যতাও ছিলো না । তবুও রাজনীতির বদান্যতায় ১৯৭৯ সালের ১৮ ই মে ত্রিপুরা সরকারের তৃতীয় শ্রেনীর কর্মচারী হিসাবে  পঞ্চায়েত দপ্তরে পেয়ে গেলাম নিয়োগ পত্র । একটু সাশ্রয়  মিললো বটে , ঠানা পোড়েন মিটলো না । তিন বৎসর যেতে না যেতেই আমি ঘোরতর অসুস্থ হলাম , বাবা গতর খেটে খেটে গত হলেন । শুরু হল আমার সংসারে তীব্র জীবন সংগ্রাম। পাশাপাশি কর্মচারী আন্দোলনেও ।

 

বাবার অবর্তমানে সংসারের যাবতীয় নৈতিক গুরুদায়ীত্ব গুলি নিলাম নিজের হাতে । একে একে সব সম্পন্ন  করে আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি  , তাতে মনে হয় , পৃথিবীতে এমন কোনো কাজ নেই যা করলে জীবন ব্যর্থ হয়। জীবন এতই বড় ব্যাপার যে একে ব্যর্থ করা খুবই কঠিন.....দুঃখ কষ্ট সংসারে থাকেই । দুঃখ কষ্ট নিয়েই বাঁচতে হয় । মাঝখানে সব কিছুর মধ্যে আনন্দ বিনোদনেরও তো মোটেই কৃপণতা থাকে না বলে মনে । জীবনে পেয়েছি খুবই কম, কিন্তু দিয়েছি বা দিতে চেয়েছি অনেক ।  জানিনা কেন আমাকে কেউ বুঝতে চায়নি । আমি কি এতটাই জটিল!!! –

আজ এই ব্যস্ত সময়ের সামান্য অবসরে কিংবা কোন বর্ষণ মুখর সন্ধ্যায় মনটা 
হারিয়ে যায় সুদূর অতীতে। মন পবনের নাওয়ে রঙ্গিন পাল তূলে দেই, ভাবনাগুলো 
ডানা মেলে নীল আকাশে । চেনা মাটির গন্ধ মনকে ব্যাকুল করে দেয়, মন চায় এখুনি
ছুটে যাই সেই ছেলেবেলায়। গাছে গাছে হরেক রকম পাখির কিঁচির মিঁচির অথবা 
ছড়ার  জলে হাঁসদের জলকেলি আমার চিন্তা চেতনাকে এলোমেলো করে দেয়। আকাশে 
রঙ্গিন ঘুড়ি, প্রজাপতি, ঘাস ফড়িঙের উড়া উড়ি -সব, সব মনে পড়ে। ঝিঁঝিঁ 
পোকাদের একটানা সুরের মুর্ছনা কিংবা টুপ করে ডোবার  জলে ডুব দিয়ে মাছ তূলে
নেওয়া মাছরাঙ্গাটা হাতছানি নেয়। আরও হাতছানি দেয় উদাসী দুপুর, রাঙ্গা 
গোধূলি কিংবা বিষণ্ণ বিকেলে অবিরাম রিমঝিম বৃষ্টির শব্দ। অবচেতন মন তাই গুন
গুন করে গেয়ে ওঠে ...

                     ‘‘ উঠোনটা আজ পুকুর যেন
                      মনে পড়ে শীল কুড়োনো
                      পা ডুবিয়ে হাটুজলে
                      খুঁজি সেদিন নতুন করে...”

 

কোথায় যেন শুনেছিলাম, মন খারাপ হলে কষ্টের গান শুনতে হয়। গানের কষ্টে, মনের কষ্টে কাটাকাটি হয়ে যায়।

 

 

 

 

মন ভালো নেই। মন ভালো নেই। কেন যেন মন ভালো নেই। মন ভালো হচ্ছে না। দিন গুলো সব ক্লান্ত আর বিষন্ন। রাত গুলো হয়ে উঠছে স্বপ্ন হীন। চেষ্টা করছি মন ভালো করার, হচ্ছে না । কোথায় যেন কি একটা থাকার কথা ছিলো, নেই। নিজেকে কেমন যেন আশ্রয় হীন, অসহায় একজন মানুষ মনে হচ্ছে। পুরো পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। অথচ মন খারাপ করে থাকতে ভালো লাগে না আমার। কক্ষনো না।

                                 “ নদী মরে যায় শুকোলেই
                                   এমন তো কোনো কথা নেই
                                   আবার শ্রাবণ এসে ভরে দিয়ে যায়
                                   তৃষিত নদীর বুক
                                   আলো নেভে দিন ফুরোলেই
                                   এমন তো কোনো কথা নেই
                                   জোনাকি প্রদীপ হয়ে জ্বেলে দিয়ে যায়
                                   তিমির রাতের মুখ ।’’
 ‘বছর শেষ হলেও দোকানীরা তাদের সব হিসাব মেলাতে পারে না কাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই বাকী রাখতে হয়, তবু কি তারা শুভ হালখাতা উদযাপন করে না’?
‘যেখানে আশার সাগরে সব ঢেউই নিরাশার,আবার ঢেউগুলোর বসবাস আশার বুকে’।সময়ের সাথে সাথে জীবনের ঝামেলা গুলো আরো বেশি করে খুঁজে নেবে । নিস্তার নেই একদমই। তাই আমাকেই খুঁজে নিতে হবে আনন্দ গুলোকে।

                     “ ঝড়ের হাওয়ার শেষে ক্ষীণ বাতাসের মতো বয়ে,
                      আগুন জ্বলিয়া গেলে অঙ্গারের মতো তবু জ্বলে, ব
                      আমাদের এ জীবন! — জীবনের বিহ্বলতা সয়ে
                      আমাদের দিন চলে — আমাদের রাত্রি তবু চলে;
                      তার ছিঁড়ে গেছে — তবু তাহারে বীণার মতো করে
                      বাজাই, যে প্রেম চলিয়া গেছে তারই হাত ধরে! ’’

   এখন দুপুর , একটু পর বিকেল হবে , তারপর সন্ধ্যা নামবে , রাত আসবে।      

          আজ আমার মন ভালো নেই । বসছে না মন কিছুতেই ।
                            =============

Read more…

আমার স্বপ্ন

             আমার স্বপ্ন  

      

আমি বিকল্প এক বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন আকঁছি ।

যেখানে হিংসা আর হানাহানিতে ,

মলিন হবে না শিশুর নির্মল হাসি ।

অথবা

আবাল বৃদ্ধের রক্তে রঞ্জিত হবে না

গাজা ভূখন্ডের মতো

পীচ ঢালা রাজপথ ।

বিকৃত হায়েনাদের কামনায় ,

লুন্টিত হবে না মা-বোনের ইজ্জত ।

অথবা

মেকি সন্ত্রাস দমনের নামে ,

আগ্রাসন হবে না কোন দেশের স্বাধীনতা ।

কিশোর কিশোরীর কল্লোল উচ্ছাসে

মুখরিত হবে সকল বিদ্যাপীঠ ।

হয়তো আমার স্বপ্নের ভাবনা ,

এ ছোট্ট জীবনে দেখা হবে না ,

কিন্তু সেদিন আর বেশি দূরে নয় ,

যেদিন নির্যাতিত শোষিতের আর্তনাদে

অথবা

দেওয়ালে পিঠ লেগে যাওয়া সমাজ হতে

বেরিয়ে আসবে শত শত  

বিস্ফোরিত অগ্নি স্ফুলিংগ ।

আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হবে ,

প্রকম্পিত হবে স্বৈরাচারীর কালো হাত ।

অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে  

রুখে দাঁড়াবে বিপ্লবী জনতা ।

নতুন মোড়কে উজ্জিবিত হবে

শোষন মুক্ত সুস্থ সমাজ ।

মুক্তির উল্লাসে মেতে উঠবে ,

    সুন্দর এক পৃথিবী

Read more…


একটা সময় ছিলো

যখন তখন তাকে ফোন করতাম ,

দিনে দিনে আজ তা’ প্রায় শূন্যের কোটায়

যে ফোনটা ক্রীং ক্রীং বেজে উঠতো দিনে সতের বার ,
কমতে কমতে আজ আর বাজে না ।

কাউকে ভাবার আগে তার কথা মনে হতো।

সময় অসময়ে ছুটতাম তার কাছে

সেও আসতো ছুটে , প্রানের টানে বা তার প্রয়োজনে ।

এক সময় সব প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় ,

যোগাযোগের তালিকায় নামটাই আর থাকে না ।

ফোন কিংবা দু’জনার আসা যাওয়ার

তাগিদটাই যায় ফুরিয়ে ।

অতচ আমার জন্য তার ভালোবাসায় খামতি ছিলো না কোনো, 
তাকেও বেসেছি ভালো সবটুকু দিয়ে সারাকাল। 
হেঁটেছি মাইলের পর মাইল পথ, হাতে রেখে হাত
দিনরাত খেয়া পারাপার একসাথে হাসি কান্না, 
সুখে দুঃখে দেয়া নেয়া আনন্দ বেদনার ভাগ —
কতকাল কতদিন হিসেব করিনি কোনদিন। 

কিন্তু স্মৃতিতে জমে ধুলো , অতীত হয়ে যায় ধোয়াচ্ছন্ন । 
তারও কিছু পরে , একটা সময় আসে ,

ফোন নাম্বারটা কিংবা তার চেহারাটা , কোনোটাই আর

মনে করার সময় থাকে না ।

হঠাৎ কোন এক পড়ন্ত বেলায়

বৃষ্টি পড়া সন্ধ্যায় , নিরালায়

যদিবা তার কথা মনে পড়ে ,

হাহাকার করে ওঠে মন ,

মোচড় দিয়ে ওঠে অন্তর ।

মানুষটা এখন কোথায় আছে,,
কেমন আছে........?

হাত বাড়ালেই যাকে ছোঁয়া যেত,,
চোখ মেললেই যাকে দেখা যেত,

 সে এখন যোজন যোজন দূরে।
 জীবনের ঘাত--প্রতিঘাতে
বাস্তবতাকে আমরা অস্বীকার
করতে পারিনা ।

তবুও শত অধিকারের

 অভিমান বুকে চেপে আমরা বেঁচে থাকি।

অসহায় বেদনায় যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাই।

এভাবেই একদিন সব লেনদেন শেষ
করে হারিয়ে যাই    

বিষন্ন মেঘমালার ভীড়ে.....এই তো নিয়ম ।

 

Read more…

এমনিতেই বাঙালির নস্টালজিক বলে ‘খ্যাতি’। তার উপর বৃষ্টিভেজা গ্রামবাংলা যেন মনকে আরও বেশি রোমান্টিক ও স্মৃতিমেদুর করে তোলে। এক ধাক্কায় তাই বার বার ফিরে যাই ফেলে আসা সেই দিনগুলিতে। আসলে, গ্রাম বাড়ীর বাইরে থাকায় আজ সে  পুজো মানে, শুধুই স্মৃতি রোমন্থন আর দীর্ঘশ্বাস!
শরত্ মানে— ধানে ভরা সবুজ খেত, নীল-সাদা আকাশ, গুচ্ছ গুচ্ছ কাশফুল— সব মিলিয়ে বাতাসে পুজোর গন্ধ, যা ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি থেকেই  হাওয়াতে উড়তে শুরু করে। জীপে বাসে ভিড়, দোকান বাজারে ভিড়, এক দিকে কাদা চপচপে রাস্তা আর তার মাঝেই কোথাও কোথাও বাঁশ পোঁতার গর্ত। কখনও আকাশের গোমড়া মুখ আবার কখনও বা সেখানে সাদা মেঘের ভেলা। ভ্যাপসা গরম অল্প অল্প ঠান্ডা, কোথাও ঝরে পড়া শিউলি বা বাসে যেতে যেতে আধা সম্পূর্ণ প্রতিমা দেখতে পাওয়া— সবই পুজোর গন্ধ বয়ে আনে। ষষ্ঠী থেকে নবমী ঢাকের বাদ্যি, মাইকে হালফিলের গান থেকে শুরু করে পুরনো গানের সুর, ধূপ-ধুনো, ফুল, ফল-মিষ্টি-ভোগের মিলিত গন্ধ, চতুর্দিক আলোয় আলোময়, বোঝা যায় মা এসে গিয়েছেন বাপের বাড়ি। ষষ্ঠীর দিন বোধন দিয়ে সারা বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি হয়। তার পর চার দিন তো শুধুই আনন্দে কাটানো। পুজো মানে, কোনও নিয়ম না মানা— যখন ইচ্ছে ওঠো, যা ইচ্ছে করো, যত ক্ষণ ইচ্ছে আড্ডা মারো, যা ইচ্ছে খাও— এক কথায় নিজের খেয়ালখুশি মতো চলা। এ জন্যই পুজোর সময় এই গ্রাম  ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়ার কথা মনেই হয় না। ‘আমার গ্রামের পুজো’ আর ‘আনন্দ’ সমার্থক— একটা সারা জীবনের অভিজ্ঞতা।

পুজোর কাউন্টডাউন শুরু হয় মহালয়া থেকে। ছোটবেলায় ওই দিন ভোর পাঁচটায় বাবা মা ডেকে দিতেন কেননা রেডিওতে মহালয়া শোনাটা ছিল বাধ্যতামূলক। ভোরবেলা উঠতে হত বলে তখন খুব কান্না পেত। ছেলেবেলার নিয়মটা নিজের অজান্তেই যে মনের মধ্য গেঁথে গিয়েছে সেটা টের পেলাম বেশ বড় হয়ে, গ্রামের বাড়ী ছাড়ার পর। এখন এলার্ম দিয়ে নিজেই উঠি ভোরবেলায়, সিডিতে , টিবিতে মহালয়া শোনার জন্য! সেই পরিচিত আওয়াজে চণ্ডীপাঠ না শোনা অবধি মনে হয় না পুজো এসেছে।

জীবনের এক এক পর্যায়ে পুজোর আনন্দ এক এক রকমের। একদম ছোটবেলায় পুজোর মানে ছিল পড়াশোনা বন্ধ করে, নতুন জামা পরে বাবার হাত ধরে ঠাকুর দেখা।  মহালয়ার  পরের দিন গুলোতে বাজারে  আসতাম নতুন জামা কিনতে। উত্তেজনা, উত্সাহ, আনন্দ— কত কী যে ছিল সেই জামা কেনার মধ্যে। আজ যত জামা কাপড়ই কিনি না কেন সেই আনন্দটা কিছুতেই আর ফেরত আসে না। স্কুল ছুটি পড়ত পঞ্চমীর দিন।  ষষ্ঠী থেকে নবমী সকালে তাড়াতাড়ি উঠে স্নান সেরে বাড়ির সবাই মিলে বেরোতাম গ্রামের  দূরে দূরে পুজোগুলো দেখার জন্য। মনু, মাছলী , শিব বাড়ী ,করমছড়া — এক এক দিন এক এক জায়গার পুজো দেখা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু দেখতাম— মণ্ডপ থেকে শুরু করে আলো, মূর্তি সব কিছু। যখন ফিরতাম তখনও মনে ক্লান্তি থাকত না। শুধু মনে হত স্বপ্নের মতো একটা দিন উড়ে গেল। সারা দিন স্বপ্নের গ্রামে  ঘোরা, নতুন নতুন জিনিস দেখা— শিশু মনের স্বপ্ন! রাতে শুয়ে মনে মনে আওড়ে নিতাম , স্কুল খোলার পর বন্ধুদের কী কী গল্প করব। কিছু যেন বাদ না পড়ে যায় আবার!

একটু বড় হয়ে পুজো আবার অন্য রকমের। সকালে উঠে, তৈরি হয়ে পাড়ার প্যান্ডেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারা। দুপুরবেলা বাড়ি ফিরে মায়ের হাতের ভালমন্দ খেয়ে পূজাবার্ষিকী নিয়ে বসা। তার মধ্যেই একটু ভাতঘুম। অষ্টমীতে নতুন পোষাক পরে অঞ্জলি দেওয়া। বিকেলে পরিপাটি সেজেগুজে বন্ধুদের সঙ্গে এ প্যান্ডেল থেকে ও প্যান্ডেল, সিঙ্গারা জিলিপি, আইসক্রিম আরোও কত কি খাওয়া । আবার কোনও দিন বাড়ির সবার সঙ্গে  ঠাকুর দেখতে যাওয়া। কোনও দিন আবার কিছুই না করা, আদ্যপান্ত একটা অলস দিন কাটানো— শুধু বই পড়ে বা সিনেমা দেখে বা বাড়িতে আড্ডা দিতে দিতে ক্যালোরির চিন্তা না করে রসনাকে তৃপ্ত করা। সংক্ষেপে বলতে হলে  পুজো মানে ছিল বছরের তিন চারটে দিন চাপমুক্ত হয়ে হয়ে শুধুই জীবনকে

উপভোগ করা।

এখনও নতুন ক্যালেন্ডারে আগে পুজোর তারিখ দেখি। অগস্টের পর থেকেই পুজোর দিন গুনি। মনে মনে প্রার্থনা করি পুজোর দিনগুলোতে যেন কাজের চাপ না থাকে বা পুজোর তিন দিনের মধ্যে দু’দিন যেন শনি রবিবার পড়ে। সম্ভব হলে সকাল থেকেই মণ্ডপে থাকি, অঞ্জলি দিয়ে ভোগ খাই। বিকেলে মণ্ডপে বসে আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে রাতে পুজোসংখ্যা নিয়ে বসি। একটু হলেও রোজকার জীবন থেকে আলাদা জীবন কাটাই! এখনও নবমীর দিন মন খারাপ হয়ে যায়, ঠাকুরের মুখটাও যেন করুণ লাগে। দশমীর দিন সকাল থেকেই একটা ম্যাজমেজে ভাব আসে, উদাস উদাস লাগে। ‘দুর্গা ঠাকুর কেন এক মাস থাকে না!’ ছোটবেলার এই আক্ষেপটা এখনও আসে মনে। সবই করি কিন্তু কোথায় যেন একটা কী নেই কী নেই ভাব থেকে যায়।

ঠাকুর দেখা, পুজোসংখ্যা, বাঙালি খাবার, আড্ডা, কিছুটা অবসর— সবই তো আছে! তবু কেন দীর্ঘশ্বাস পড়ে গ্রামের পুজোর দিন গুলির কথা ভেবে? খুব একটা চিন্তা না করেও বুঝি, আমি যে ‘মিস’ করি আমার প্রিয় গ্রামকে , উত্সবের সাজে সুন্দরী গ্রাম বাংলাকে , এ গ্রামে  ফেলে আসা আমার পুরনো দিনগুলোকে, আমার পরিবার, পরিজন, বন্ধুদেরকে। দশমীর দিন তাই সেই ছোট্ট শিশুটির  মতোই মা দুর্গার কানে কানে বলি, “সামনের বার যেন আমার প্রিয় গ্রামে  তোমার সঙ্গে দেখা হয়। যেন আবার আগের মতোই কাটাতে পারি এই চারটে দিন।” আর বলি, কৈলাসে গিয়ে মহাদেবকে বলতে, আমার গ্রামের  সব খারাপ কে ভাল করে দিয়ে তাকে সব থেকে সুন্দর করে দিতে... মার থেকে ভাল আর কে বুঝবে যে, প্রিয়জনের নিন্দা সহ্য হয় না!

Read more…