<

Avijit Roy's Posts (2)

চিহ্ন

জীবনে কিছু সময়ে কিছু দুঃখ আসে

আবার আসে সুখ

সময়ে অনেকেই ভেঙে পরে

আবার সময়ে অনেকের উল্লাস আসে

 

কোনটাই ঠিক নয় কারণ

জীবনে চলতে গেলে সুখদুঃখ দুই আসে

সময়ের আয়নায় সুখদুঃখ একই কাহিনী

আসলে আমরা যে যেমন

তার প্রতিবিম্বটি ঠিক তেমন

কখন অতি আনন্দে কাঁদি

বা অতি আনন্দে হাসি

 

কিন্তু অতি দুঃখে সহজে কেউ হাসে না

একমাত্র হাসতে পারে পাগল

কারন সময়ের আয়নায়

ঈশ্বর তার হয়ে স্বাক্ষর রেখে যায়

আর বাকী আমরা রেখে যাই

আমাদের চরিত্রকে

Read more…

তুলসী মালা

 আজ অবসর গ্রহণ করলাম ।   সরকারি বাসস্থান ছেড়ে দক্ষিণ ভারতের চেন্নাই রেলওয়ে ষ্টেশনে বিকেল বেলা বসে কলকাতাগামী মেলের অপেক্ষায় । ভাবছিলাম- নিজের শহরে ফিরে যাচ্ছি, দীর্ঘ দিন নিজের বাড়ি ঘর ছেড়ে চাকরি সূত্রে বাইরে বাইরে কাটালাম, পরকে আপন করলাম আর অবসরের পরেও আপনকে আরো আপন করে পাওয়ার আশা করছি - সত্যি কি তা সম্ভব হবে ? অনেক প্রশ্ন এসে উঁকি দিচ্ছিল আমার মনে । যদিও গত মাসে আমার ছত্রিশ বছরের কর্ম-জীবনের প্রকৃত অবসর হয়েছিল, শুধু এক মাস সময় নিয়েছি, নিজের সব কিছু গোছাতে, আজ মনে হল বাসিবিয়ের ভাঙ্গা-পর্বের কন্যা বিদায় যেন; আমাকে ছাড়তে অফিসের অনেক সহকর্মীরা রেলওয়ে ষ্টেশনে এসেছেন, কেউ কেউ হাতে  করে এনেছে ফুলের তোড়া, যেন বিদায় জানানোর অপর নাম-এক গুচ্ছ ফুল, ঠিক তেমনই হুইসেল দিয়ে প্লাটফর্ম ছেড়ে চলে যাওয়াকে মনে হোল, আমার হয়ে ট্রেনটা বলে দিল, চললাম তোমাদের ঘনিষ্ঠতার বেড়াজাল টপকে।

 একেবারে ঝাড়া-হাত-পা আমার, মেয়ের পড়াশোনার জন্য পরিবারকে দুবছর আগেই খড়গপুরে পাঠিয়ে দিয়েছি, একলা সময় কাটানোটা বড়ই মুশকিল। এ.সি কামরায় কাঁচের জানলা দিয়ে দূরে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, জামার বুক পকেট থেকে স্মার্ট ফোনটা বের করে রিসিভ মেসেজগুলোকে দেখতে লাগলাম।

কিছুক্ষণ পরে খেয়াল করলাম মাঝ-বয়সী এক ভদ্রমহিলা আমার সামনে দাঁড়িয়ে,বয়স প্রায় বছর পঞ্চাশের কাছাকাছি হবে। বেশ বোঝা যায় অযত্নেও তার সুন্দর চেহারায় এক অভিজাত পরিবারের ছাপ যার জন্য স্বাস্থ্য বা সৌন্দর্য রক্ষার বিশেষ কোন যত্নের প্রয়োজন হয় না ।  মৃদু হাসছেন আমি কিছু বলতে যাওয়ার আগেই বলে উঠলেন ‘আমি এখানে একটু বসতে পারি ?’ একটু ইতস্তত হয়ে বললাম ‘বসুন’। অনেক জায়গা থাকা স্বত্তেও ভদ্রমহিলা প্রায় আমার পাশ ঘেঁষেই বসলেন। বেশ বডি পাউডার মার্কা মেয়েলি একটা মিশ্র গন্ধ নাকে ভেসে আসছিল, চলন্ত ট্রেনের ঝাঁকুনিতে মাঝে মাঝে ওর মৃদু স্পর্শ টের পাচ্ছিলাম, কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার মতো তখন আমার অবস্থা। আর ঠিক সেই সময় নিজেকে চেন্নাই এক্সপ্রেসের শাহরুখ খান বলে মনে হতে লাগলো, মনেমনে হাসি আসছিল। দেখলাম ওর হাতটা এসে আমার হাতকে স্পর্শ করল! বোবার মতো আমরা দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরে আমি আমার ঘোলাটে দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলাম, ওর চোখের একটা দুষ্টুমির রেখা।

 আর সহসা চোখের পলক দুটো ফেলে আমাকে বলল- ‘তুমি যতই পালাতে থাক না কেন, আমি তোমাকে ধরে ফেলবই অধীর, আমি কবে থেকে তোমাকে খুঁজছি, আর তুমি তার উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করলে না ? কোন দিনও বুঝি আমার জন্য এতটুকু মায়া হয়নি?’

 তখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না, আমার নাম তো অধীর না- তবে অধীর নামে ভদ্রমহিলা কেন সম্বোধন করল? আমার তো কোন যমজ ভাইও নেই। সুতরাং জীবনে তো কোন দ্বৈত ভূমিকা আসার সম্ভাবনা নেই,  আর কেনই বা আমাকে খুঁজবে? আমি যে একজন ঘোরতর সংসারী । ভদ্রমহিলা ততক্ষণে বলতে শুরু করলেন... ‘আমি তোমাকে যে প্যাকেটটা নবীনকে দেওয়ার জন্য দিয়েছিলাম, তারপর থেকে তুমি আর দেখা করলে না, হয়তো সেদিন আমার অনুরোধ তোমার ভালো লাগেনি, তাই তুমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার অনুরোধকে উপেক্ষা করতে পারনি। ভেবেছ আমি সুযোগ সন্ধানী, সে জন্যেই তুমি আর দেখাও করনি। কিন্তু আমি তো শুধু তোমার মুখে নবীনের খবরটা শুনতে চেয়েছিলাম অধীর।' অজ্ঞাতে আমার মুখ দিয়ে তখন বেরিয়ে গেল- ‘না না মনে করার কি আছে?’ এই কথা শুনে ভদ্রমহিলা আমার চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে, আমার হাতদুটোকে চেপে ধরলেন । আমি অস্বস্তি পাওয়ার আগেই বলে উঠলেন- ‘আমি তো তোমাকে অনেক দিন ধরে জানি তুমি এরকম না, তবুও মেয়েদের মন তো ,তাই দুশ্চিন্তা করতাম। আচ্ছা তাহলে কিছু মনে করনি তো?’ কি আর করি, বাধ্য হয়ে ভদ্রমহিলাকে উত্তর দিলাম, ‘না’ । কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে বিস্ময়ে তাকিয়ে বলতে লাগলেন- ‘এখন আমি  গুরুবাবার কাছে আর যাইনা, সে নিয়ে আগে তোমরা কত হাসাহাসি করতে, এখন ও'সব ছেড়ে দিয়েছি । শুধু তোমার কাছে একটা শেষ অনুরোধ, এখন তোমাকে একটা প্যাকেট দেব, তুমি সেটা নবীনকে দিয়ে দিও।'

 কোথায় প্যাকেট? কোন প্যাকেটের চিহ্নমাত্র নেই সেখানে... আর নবীন বা কে ? যাই হোক আমার তাতে কি আসে যায়, শুধু আমার একটা হ্যাঁ বলাতে ও যদি খুশী হয় তাতে দোষ কোথায় ? তাই উত্তর দিলাম- ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’  ততক্ষণে আমি দেখতে পেলাম একটা মলিন আলোর দূ্তিতে ওঁর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে উঠল আর আস্তে আস্তে উঠে কোথাও যেন চলে গেলেন ।

 অনেকটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচার মতো আমার অবস্থা তখন, যাকগে এ'রকম কত ঘটনা  নিত্য ঘটে, তাতে বিচলিত হওয়ার কি আছে । স্মার্ট ফোনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলাম, কিন্তু বারবার কমপার্টমেন্টের যাওয়া-আসার রাস্তার দিকে নিজের মনের অজান্তে দৃষ্টিটা চলে যাচ্ছিল- এই বুঝি ভদ্রমহিলা আবার প্যাকেট হাতে করে এলেন। আস্তে আস্তে সময়টা পার হয়ে গেল, অনেক রাত্রি হল কিন্তু তার আর দেখা পেলাম না।

 চা-ওয়ালা আর হকারের চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে সকালের ঘুমটা অনেক আগেই ভেঙ্গে গিয়েছিল। তাই দাঁত মেজে টয়লেট সেরে অভ্যাস মতো চা-ওয়ালার কাছ থেকে এক কাপ চা নিয়ে খাচ্ছিলাম আর ব্রিফকেস খুলে আগের দিনের বাসি কাগজটার না-দেখা সংবাদগুলোতে চোখ বুলাচ্ছিলাম।

 কিছুক্ষণ পরে দেখি এক লম্বাটে উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের ভদ্রলোক, আমার থেকে হয়তো একটু বেশী বয়স হবে। এগিয়ে এসে আমার সিট নাম্বারটা আমাকেই জিজ্ঞাসা করছেন, আমি একটু বিরক্ত হয়েই ওকে বললাম ‘হ্যাঁ এটাই আমার সিট, চেন্নাই থেকে খড়গপুর পর্যন্ত রিসার্ভ।' একটু সাবধানী হয়ে ভদ্রলোকটি বললেন- ‘না না সে কথা আমি বলছি না, কিন্তু আপনাকে খোঁজাটাই আমার আসল উদ্দেশ্য, আমি কি এখানে বসতে পারি?’  আমাকে খোঁজার কথা শুনতেই, মনে মনে আমার একটু কৌতূহল হোল, বললাম - বসুন।

 আমার পাশে বসে বিনা দ্বিধায় সে বলতে লাগল, ‘কালকে যে ভদ্রমহিলা আপনাকে এসে কোন এক প্যাকেট দেওয়ার অনুরোধ করেছিল, উনি আমার স্ত্রী । আজ প্রায় পনেরো বছর হোল আমার ছেলে নিখোঁজ, কিন্তু ও জানে আমাদের ছেলে বেঁচে আছে, ত্রিবান্দ্রামে বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টারে আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে গবেষণা করছে। আপনার  সাথে আমার ছোট ভাই অধীরের চেহারার বেশ মিল আছে তাই আপনার প্রসঙ্গে ও যখন আমাকে বলল- “অধীর পাশের কামরায় বসে আছে”, তখন আমি অনুমান করেছিলাম ও কোথাও একটা গণ্ডগোল করে এসেছে । অনেক দিন ধরে আমার স্ত্রীর চিকিৎসা চলছে এবং ডাক্তার বলেছে এটা একধরনের মানসিক ব্যাধি, আপনি কিছু মনে করবেন না, ওকে নিয়ে মাঝে মাঝেই আমাকে এ'রকম অসুবিধা সামলাতে হয়, এখন বয়স হয়েছে আমি ছাড়া ওর আর কেউ নেই, তাই সব সময় ওকে চোখেচোখে রাখতে হয়।’ কথাগুলো বলেই, ভদ্রলোকটি একটা ক্লান্তির হাসিতে আমার দিকে চাইলেন।

 ভদ্রলোকটির চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে আমার ভীষণ মায়া হোল। অজান্তেই আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল- আপনার ছেলের কত বয়স ছিল, আর কি হয়ে ছিল? আমার প্রশ্নে সহসাই ওর মুখটা নিচু হয়ে গেল, আমার খারাপ লাগছিল তখন, কেন যে আমি এরকম প্রশ্ন করলাম ওকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটু সপ্রতিভ হয়ে আমার দিকে চেয়ে বলল, ‘আমি পি ডাবলু ডির একজন অবসর প্রাপ্ত চিফ ইঞ্জিনিয়ার আর আমাদের একমাত্র পুত্র সন্তান ছিল নবীন, ছোটবেলা থেকেই ভীষণ বাধ্য ছিল, পড়াশোনায় খুব মেধাবী, হায়ার সেকেন্ডারি ভালো ভাবে পাস করে, প্রথম সুযোগেই এন-আই-টি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এন আই টি দুর্গাপুরে ইলেট্রনিক্স এন্ড টেলিকমিউনিকেশন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পায়। আমার স্ত্রী পূজাপাঠ-গুরুদেব-ধর্মকর্ম নিয়ে সারা দিন মেতে থাকতে ভালোবাসে আর আমিও কোনদিন কোন কিছুতে ওকে কখন মানা করিনি। ছেলের পরীক্ষায় সফলতায় ও স্ত্রীর ইচ্ছায় বাসায় গুরুদেবের আগমন অনুষ্ঠানে তাই প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করে বেশ ধুমধাম করে পালন করলাম, সেই অনুষ্ঠানে গুরুদেব এসে আশীর্বাদ করে, তুলসী-র একটা মালা আমার ছেলের গলায় পড়িয়ে দিয়েছিলেন।  এরপর আমরা ছেলেকে দুর্গাপুর কলেজ-হোস্টেল রাখতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের অফিসের গেস্ট-হাউসে এক সপ্তাহের মতো সপরিবার উঠি, আমার বেশ মনে আছে, হোস্টেলে ছাড়ার দিনে ওর মা কাঁদতে কাঁদতে ওকে জরিয়ে ধরে বলেছিল, বড় মানুষ হওয়ার জন্যে তোকে এখানে রেখে গেলাম, মালাটা খুলিস না বাবা, এটা সব সময় তোকে রক্ষা করবে।'

 এরপর ভদ্রলোকটি বলতে থাকেন -‘তারপর আমরা কলকাতায় ফিরে আসি। এক সপ্তাহ পরে ছেলে মাকে চিঠি লিখল-- শ্রীচরণেষু মা, তোমার তো মনে আছে, তুলসীর মালাটা তুমি খুলতে মানা করেছিলে- বলেছিলে দেহ ও মন পবিত্র রাখবে। যেদিন কলেজে ভর্তি হ'লাম,সে'দিনই ক্লাসের মেয়েরা আমার নাম দিয়েছিল তুলসী,  কিচ্ছু মনে করিনি... ভেবেছিলাম ওরা আমার পবিত্রতাকে দেখেছে। দুদিন বাদে ফ্রেশার ওয়েলকামে নীল টিভির পর্দায় উলঙ্গ মেয়ে দেখে আমি মুখ নিচু করি, তা'তে সিনিয়ার ছেলেরা হাসাহাসি করেছিল, আমাকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে পাছায় হাত রেখে আমায় বলেছিল বুঝলি একেই বলে র‍্যাগিং, তুলসী এবার বুঝি তুই মানুষ হোলি।  আমার পবিত্রতাকে ওরা উল্লাসে পান করছিল, সেদিন রাতের অন্ধকারে হোস্টেলের টয়লেটে গুমরে কেঁদেছি । পরের দিন প্রিন্সিপ্যাল মহাশয়কে ব্যাপারটা জানাতে উনি বললেন- “তুমিও ছাত্র ওরাও ছাত্র একটু মানিয়ে চল”। - মানিয়ে তো চলছিলাম কিন্তু ওরা এসে বলল - “প্রিন্সিপ্যালকে নালিশ করেছিস, নিজেকে সুরমা ভাবিস... ?” নাকে ঘুষি মেরে বলেছিল, “এবার শুধু মুখের ভূগোলটা পাল্টে দিলাম” । দু'হাতে নাকের গড়ানো রক্ত চেপে ধরে পরদিন তোমাকে চিঠি লিখেছিলাম,  শ্রীচরণেষু মা, পরের মাসে একটু বেশী টাকা পাঠিও আমি হোস্টেল ছেড়ে জনতা মেসে উঠেছি।

একদিন মেসের বাসন মাজার আট বছরের মেয়েটা কাঁদছিল, জিজ্ঞেস করেছিলাম, কি হ'য়েছে রে তোর? ছেঁড়া সালোয়ারটার মাঝখান দিয়ে মেয়েটা অপবিত্রতার অনেক চিহ্ন দেখাল আমাকে। মেস মালিককে ব্যাপারটা জানাতেই, মেসের কিছু ছাত্র আমাকে জামার কলার ধরে শূন্যে উঠিয়ে বললো- “শালা তুলসী মুখের ভিতর দিয়ে বাঁশ ঢুকিয়ে পেছন দিয়ে বের করে দেব, মালা খোল, মানুষ যদি না হবি তবে আমরাই তোকে মানুষ করবো”। সেদিন পাশে কেউ ছিল না, কিল-চড়-ঘুষি-লাথি আর শুধু বুকভরা ব্যাথাই ছিল সেদিনের সাথী।  মা, আমি শেষরক্ষা করতে পারিনি, তুলসীর মালাটা ওরা ছিঁড়ে ফেলেছে, থানায় গিয়েছিলাম সেখানে দেখলাম যে পুলিশ ওদের সমর্থনে কথা বলল, পরে মেস-মালিককে জানালে তিনি তো রীতিমতো অস্বীকার করে ওঠেন, ভয় দেখিয়ে বললেন ওদের মধ্যে একজন মহামান্য এম-এল-এ’র পুত্র আছে ওরা এমন ঘৃণ্য কাজ করতেই পারে না, আমারই ভুল। মা, পুলিশ প্রশাসন গণতন্ত্র সব কিছুই ওদের হাতে, ওরা নিজেদের ইচ্ছা মতো গণতন্ত্র তৈরি করতে পারে। আমাকে তোমরা ক্ষমা করো, আমি আর মানুষ হতে চাইনা, ভাবছি কলেজ ছেড়ে দেব। আমার ছোট ঘরে একটাই জানলা, বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, -তোমার হাতের লাউ-ঘণ্ট বহুদিন খাইনি।’

 এক নিশ্বাসে ভদ্রলোক গরগর করে মুখস্ত করা ছেলের চিঠিটা আমাকে বলে গেল, একটা গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস পুত্রহারা বয়স্ক ব্যক্তির বুকের ভিতর থেকে  উষ্ণ বাষ্পের আকারে বেরিয়ে এল, আমি অনুভব করেছিলাম, সন্তান-হারা ওর মনের অবস্থাটা, অজান্তেই আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল- তারপর?

 ভদ্রলোকটি বলল- ‘তারপর থেকে ছেলেটা ফেরার, অনেক খোঁজ করেছি, জনতা মেস, হোস্টেল, কলেজ, থানাপুলিশ, উচ্চশিক্ষা পর্ষদ থেকে মন্ত্রী কিছুই বাকী রাখিনি। কিন্তু ছেলেটার কোন খোঁজ আজ অবধি পাইনি। কেউ বলে বদলা নেওয়ার জন্যে আত্মগোপন করেছে। কেউ বলে এরকম ঠাণ্ডা মাথার ছেলেদের জীবনে যখন হতাশা আসে ওরা সন্ন্যাসী হয়ে যায়। কেউ বলে মেধাবী ছেলেদের মনে সামাজিক দুস্কর্ম গুলো গভীর দাগ কাটলে, ওরা সহসাই মূলে চলে যায়, হয়তো অস্বীকৃত রাজনৈতিক দলে ঢুকে যায়।’ একটু নিশ্বাস নিয়ে ভদ্রলোকটি বলল- 'হয়তো কেউ ওকে গুম করেছে আর সুন্দর ভাবে নিশ্চিহ্ন করেছ।’

শেষে একটু উচ্চ স্বরে কাঁপা হাতে আঙ্গুল তুলে বলল- 'ওই তুলসী মালাটাই ওকে শেষ করেছে।'  আমার হাত দুটো চেপে ধরে ছলছল চোখে অনুরোধ করল- ‘আমার স্ত্রী কিছুক্ষণ পরে আপনার কাছে একটা প্যাকেট নিয়ে আসবে। অনুগ্রহ করে আপনি প্যাকেটটা প্রত্যাখ্যান করবেন না, ও চলে যাওয়ার পর, নাহয় প্যাকেটটা ফেলে দেবেন। নাহলে আমি স্ত্রীকে নিয়ে খুব অসুবিধায় পড়বো, ওকে আর সামলাতে পারব না।’ খানিকক্ষণ আমি নির্বাক ছিলাম, তার কিছু পরে ভদ্রলোকের আস্তে আস্তে উঠে চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে  ছিলাম।

 সাথে অনেক লাগেজ ছিল তাই খড়গপুর স্টেশন আসতেই কুলি ধরে সে'গুলো প্লাটফর্মে নামিয়ে গুনতে লাগলাম আর লক্ষ্য করলাম একটু দূরে আমার দিকেই হেঁটে আসছেন গতকালের সেই ভদ্রমহিলা তার পিছনে আজ সকালের সেই ভদ্রলোকটি । ভদ্রমহিলা হেসে আমার দিকে প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘বেশী সময় নষ্ট করবো না, প্যাকেটটা ওকে দিও’। আমি হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিলাম, মুখ দিয়ে আমার তখন কোন স্বর বেরচ্ছিল না । ভদ্রলোকটি বলতে লাগলেন- “তাড়াতাড়ি চলো ট্রেন ছেড়ে দেবে”, বলতে বলতে ভদ্রমহিলার হাত ধরে ট্রেনে উঠে পড়লেন । হাতের প্যাকেটের দিকে চোখ যেতেই হঠাৎ মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল । আস্তে আস্তে ট্রেনটা হুইসেল দিতে দিতে দূরে মিলিয়ে গেল।


--সমাপ্ত---

Read more…