<

Blog (ব্লগ)

প্রবল জীবন সংগ্রামের মধ্যদিয়ে মানুষ শুরু থেকে শেষাবধি পায়ে পায়ে এগিয়ে যায়। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি ক্ষনই মানুষ একটা প্রচন্ড সংগ্রামের মধ্যদিয়ে সময় পারাপার করে। জীবনের এই নিরন্তর সংগ্রামের একত্রিত ফিরিস্তিই ইতিহাস। এককথায় কর্মী মানুষের ক্ষুদ্র বৃহৎ কর্মযজ্ঞের একত্রিত কাহিনী নিয়েই সৃষ্টিহয় ইতিহাস। জীবনের সকল কৃতকর্ম তসবিহদানার মতো একত্রিত গেঁথে গেঁথে তৈরী হয় জীবনের বাস্তবচিত্র Ñ ঘটনা সমষ্টির একত্রিত সন্নিবেশইতো ইতিহাস।

বাঙালি আর বাংলাদেশের স্বাধীকার আন্দোলন, মুক্তি সংগ্রামের সুবিস্তৃত এমনি এক ইতিহাস রয়েছে। যার প্রধান পৃষ্ঠাগুলো জোড়ে রয়েছে এ জাতির জনক, বঙ্গবন্ধুর নাম। আর বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণের, তাঁর কর্মের বা জীবনীতিহাসের কথা বলতে গেলেই বীরদর্পে, আপন গৌরবে একটি নাম চলে আসে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। যাঁর ডাকনাম ছিল রেণু। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণাদাত্রী, চালিকা শক্তি, উৎসাহদাত্রী, মুজিব পরিবারের যুধিষ্ঠীর এবং গন্তব্যের দিকে সর্বক্ষনিক নজর রাখা বেগম ফজিলাতুন্নেছা। শেখ মুজিবের সেই রেণু।

১৯৩০ সালের ৮ই আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু। বাবা শেখ জহুরুল হক। মা হোসনে আরা বেগম। জন্মের মাত্র তিন বছরের মাথায় বাবা মারা যান। তখন তার দাদা শেখ কাশেম তাকে নিজের ভাইয়ের ছেলে শেখ লুৎফুর রহমানের ছেলে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে বিবাহ রেজিষ্ট্রি করান। তখন তাঁদের উভযের বয়স ছিল যথাক্রমে তিন এবং তের (প্রায়)। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে রেণু মাতৃহারা হন। তারপর তার সাতবছর বয়সে দাদাকেও হারান। এরপর তিনি লালিত পালিত হন নিজের শাশুড়ি তথা শেখ মুজিবুর রহমানের মায়ের কাছে একই পরিবারে।

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ মধুমতী বিধৌত গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম গ্রহন করেন শেখ মুজিবুর রহমানও। তাঁর পিতার নাম শেখ লুৎফুর রহমান আর মা সাহেরা খাতুন। বলতে গেলে প্রায় একই পরিবার। উভয়ের দাদারা ছিলেন পরস্পর দুই ভাই। মধ্যে মাত্র দুই হাত ব্যবধানে পাশাপাশি ঘরেই রেণু এবং শেখ মুজিবুর রহমান-এর ঘর ছিল।

ছোটবেলা থেকেই মাতৃ¯েœহের পরশে নিজের শাশুড়ির কাছে থেকে একই পরিবারে অন্যান্য ভাইবোনদের সাথে বড় হয়ে উঠেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহন করেন। তখনকার তাদের পারিবারিক নিয়ম অনুযায়ী একজন মেয়ে হিসাবে আর বাইরে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না নিলেও বাড়িতে মৌলবী ও গৃহশিক্ষকের কাছে ধর্মীয় শিক্ষা আরবী এবং বাংলা অংক ইংরেজি শিক্ষা নেন। নির্ধারিত শিক্ষা গ্রহনের পাশাপাশি তিনি নিজের আগ্রহেই অনেক শিক্ষা ও জ্ঞান ভিত্তিক বই পুস্তক পড়তেন।

প্রখর স্মরণ শক্তি, বুদ্ধিমত্তার অধিকারি ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু। ধর্য্য, সাহস, শৃঙ্খলাবোধ এবং কর্মট ও প্রত্যয়ী রেণু, ক্রমশ: একজন আদর্শ মহিলা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ, দৃঢ়তার জন্য তিনি কঠিন প্রতিকুল পরিবেশেও সাহস নিয়েই সফলতার দিকে নিজেকে, পরিবারকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। আর এটুকু করতে গিয়ে তিনি একজন মহান নেতার সহধর্মীনীর পাশাপাশি নেপথ্যের সহযোগী আর সাহসের যোগানদাতা হিসাবে কঠিনতম সময়েও প্রচন্ড দৃঢ়তার সাথে পথ অতিক্রম করেছেন এবং করতে সাহসও অনুপ্রেরণা যোগিয়েছেন বলেই সেই নেতা একটি জাতির কঠিনতম সময়গুলোতে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। আর এসব কারনেই ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব একজন মহান নেতা বা রাষ্ট্রনায়কের সহধর্মীনীই শুধু নন Ñ বাঙালীর মুক্তিসংগ্রাম এবং স্বাধীকার আদায়ের সংগ্রামের একজন অতি উল্লেখযোগ্য প্রেরণাদাত্রী, সহযোগী।

বাঙালির সুদীর্ঘ স্বাধীকার আন্দোলন, মুক্তির ডাক পৌঁছানো আর সংগঠন রাজনীতি নিয়ে নিজেকে এ জাতির জন্য নিবেদিত করে দিয়ে যে নেতা ইতিহাসে অমর। যার সারা জীবন নিবেদিত ছিল বাঙালা আর বাঙালির জন্য। রাজনীতির বৃহৎ পরিসরে যিনি নিজের কর্মনিষ্ঠা একগ্রতা দিয়ে শেখ মুজিব থেকে আস্তে আস্তে মহান নেতা, বঙ্গবন্ধু এবং জাতির পিতা হিসাবে বাঙালির হৃদয়ে স্থানলাভ করেন। সে নেতা যখন সমস্ত জাতির কথা চিন্তা করতেন তখন যিনি শক্ত হাতে তার পরিবারের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়াও বিশেষ কঠিন মুহুর্তগুলোতে বঙ্গবন্ধুকে সাহস, প্রেরণা এবং নিজের জ্ঞানদীপ্ত বা প্রাজ্ঞ মতামত দিয়েও সহযোগীতা করতেন, তিনিই বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয় রেণু।

১৯৪৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর বেগম ফজিলাতুন্নেছার কোলে জন্ম নেন তাঁদের প্রথম সন্তান শেখ হাসিনা। যদিও ১৯৪৪ সালের ডিসেম্বর মাসে তাঁর এক ছেলে সন্তান জন্ম নিয়ে মারাযান। শেখ হাসিনার জন্মের প্রায় দু’বছর পর ১৯৪৯ সালের ৫ই আগস্ট তাঁদের দ্বিতীয় সন্তান শেখ কামাল এবং ১৯৫৪ সালের ২৮শে এপ্রিল তৃতীয় সন্তান শেখ জামাল জন্ম গ্রহন করেন। ১৯৫৭ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর শেখ রেহানা এবং তাঁদের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেল জন্ম নেন ১৯৬৪ সালের ১৮ই অক্টোবর।

দেশ জাতি আর আন্দোলন সংগ্রাম নিয়ে যখন বঙ্গবন্ধু মহাব্যস্ত। তিনি যখন বার বার জেল জুলুম নির্যাতন মাথায় নিয়েও জাতির ভাগ্য নির্ধারনে কাজ করে যাচ্ছেন, ঠিক এমনি কঠিন সময়েও নিজের সংসার ছেলে মেয়েকে বড়করা এবং লেখাপড়াসহ সার্বিক দায়িত্ব অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পালন করে গেছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা। ১৯৬৭ সালের ১৭ই নভেম্বর তাঁর প্রথম মেয়ে শেখ হাসিনা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী)-র বিবাহ, বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী ড.ওয়াজেদ মিয়ার সাথে তারই তত্বাবধানে সুসম্পন্ন হয়।

শুধু নিজের পরিবার এবং সংসার নিয়েই নয়। এই দানশীল উদারহস্ত মহিয়সী মহিলা অন্য যেকোন গরীব অসহায়কে নানাভাবে সাহায্য সহযোগীতা করতেন। আওয়ামী লীগের যেকোন নেতা কর্মী বা সমর্থক জেলে থাকলে তাদের পরিবারকে দেখাশোনা বা যেকোন রকমের সাহায্য সহযোগীতা করা ছিল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের একটা প্রধান কাজের অন্যতম। নির্যাতীতা বা কন্যাদায়গ্রস্থদের আর্থিক বা অন্যান্য সাহায্য, রোগী বা অসহায়দের চিকিৎসা ও সাহায্য করা ছিল যেন তাঁর ধর্ম।

জেলে থকাকালিন শেখ মুজিবুর রহমানের মামলাগুলোর তদারকি এবং এগুলো চালানোর জন্য উকিল মোক্তার, কোর্ট কাছারি পর্যন্ত ব্যবস্থাদি তিনি নিজে করতেন। জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের স্বামী তথা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নানাভাবে তাঁর নিজের মতামত বা পরামর্শ দিয়ে সহযোগীতা করতেন। বিশেষ করে আগরতলা মামলায় বেগম ফজিলাতুন্নেছা নিজের দূরদর্শীতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে বিভিন্নভাবে সহযোগীতা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তি নেয়ার বিপক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান ইতিহাসে এক অতি দূরদর্শী ও প্রশংসিত বিষয় হিসাবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।

পৈত্রিক সূত্রে বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু নিজে অনেক সম্পত্তির মালিক ছিলেন। ছোটবেলায় বা ছাত্রজীবনে কলকাতা থাকাকালিন অথবা এর পরবর্তীতেও স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান যখন রাজনৈতিক কাজে বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়াতেন। তখন বাড়িতে নিজের পারিবারিক আয় থেকে অর্থ জমিয়ে তা স্বামীকে দিতেন। অনেকদিন পর পর যখন পারিবারের সকলের সাথে দেখা করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমান বাড়িতে আসতেন। তখন আবার চলে যাওয়ার সময় স্বামীর বিদায়কালে নিজের জমানো টাকা কড়ি তাঁর হাতে তুলে দিতেন। স্বামীর বিদায়বেলা তথা বাইরে যাত্রাকালে কখনো কেঁদে কেঁদে ‘অমঙ্গল অশ্রুস্বজল’ হয়ে সামনে দাঁড়াতেন না।

উত্থাল উনসত্তর এবং বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের কঠিনতম সময় ১৯৭১ সালের যুদ্ধপূর্ব এবং পরবর্তী সময়ে বেগম ফজিলাতুন্নেছার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন বিনির্মানে, ইয়াহইয়া ভূট্টো চক্রের সাথে বৈঠক এবং ঐ সময়ের দ্রুতপরিবর্তনশীল ঘটনা প্রবাহে তাঁর দৃঢ় সিদ্ধান্তসমূহ, প্রাজ্ঞ এবং দূর-দৃষ্ঠি সম্পন্ন ধ্যান ধারণা ও চিন্তা আর নেপথ্য দিক নির্দেশনা, সহযোগীতা ও পরামর্শ বঙ্গবন্ধুকে অনেক সফল ভূমিকা বা জ্ঞানগর্ব সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিল। জাতির জনকের পাশে থেকে তখন তিনি তার দূরদর্শীতা দিয়ে, গভীর চিন্তা ও জ্ঞান দিয়ে শুধু সহযোগীতা আর সাহসই দিলেন তা নয়। তাঁর কর্মযজ্ঞ দক্ষতা আর ত্যাগদিয়ে বাঙালির স্বাধীকার আদায় এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিও বঙ্গমাতা হয়ে বেঁচে রইলেন।

ইতিহাসে সহমরনপ্রথা সম্ভবত: রাজা রামমোহন রায়ের আমলেই বাতিল হয়েছিল। তবু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বারে কুখ্যাত ঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে যখন স্বপরিবারে নিহত হলেন জাতির জনক, তখন যেন স্বেচ্চায় সহমরনকেই বরণ করে নিলেন ইতিহাসের এই নেপথ্য মহিয়সী নারী, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণু।
*** 

Email me when people comment –

You need to be a member of আমাদের বাংলা to add comments!

Join আমাদের বাংলা

Image result for পà§à¦°à§‡à¦®à¦¾à¦¨à§à¦¤

 

 

 

আমার ভালোবাসার ভাগান ভরেনি এখনো ফুলে ফুলেজাগে

নতুন প্রশ্ন  জাগে মোহনা ভালোবাসা কাকে বলে

তুমিতো জানো জগৎ সংসারে আমি বড় অসুখি

মাতৃহীন জীবনে প্রেমের মায়া আর বুঝবো কি

সুখে…

Read more…
Comments: 0

ইচ্ছে

আমার প্রথম কবিতা ছিলআনকোরা হাতের চাপে ক্লান্ত,শেষ কবিতা হয়ে উঠুকউজ্জ্বল এক নক্ষত্র ।প্রথম ভালবাসা ছিল ইচ্ছেনদীশেষ ভালবাসা হোক সমুদ্রসাক্ষী।
Read more…
Comments: 0
Faruk Ahmed Roni liked গাজি শেখ ফরিদ's blog post প্রেমান্ত
yesterday
Faruk Ahmed Roni liked Moynur Rahman Babul's blog post স্বদেশ আমার মা আমার
yesterday
Faruk Ahmed Roni liked Moynur Rahman Babul's blog post ভয়
yesterday
Faruk Ahmed Roni liked পীযূষ কান্তি দাস's blog post "বাসনা "
yesterday
Faruk Ahmed Roni liked Avijit Roy's blog post তুলসী মালা
yesterday
Faruk Ahmed Roni liked পীযূষ কান্তি দাস's blog post "অভিমান"
yesterday
গাজি শেখ ফরিদ updated their profile photo
Tuesday
গাজি শেখ ফরিদ updated their profile photo
Tuesday
Avijit Roy liked Avijit Roy's blog post চিহ্ন
Apr 16
Avijit Roy liked Avijit Roy's blog post তুলসী মালা
Apr 14
Sarwar-E Alam updated their profile photo
Feb 13
পীযূষ কান্তি দাস commented on Moynur Rahman Babul's blog post এও তো প্রেম
"সুন্দর গল্প ।
ভালো লাগলো ।"
Jan 17
পীযূষ কান্তি দাস commented on বকুল দেব's blog post সে তুমি , আমার বাবা
"বাবা তুমি জ্বেলেছিলে
সত্যের আগুন এই মনে ,
তোমার আলোয় ভাসছি আমি
প্রতিদিন আর প্রতিক্ষণে ।
এই ভাবে পারি যেন
থাকতে অবিচল ,
প্রনাম জেনো লক্ষ -কোটি
আশীর্বাদে পাই বল ॥"
Jan 17
পীযূষ কান্তি দাস liked পীযূষ কান্তি দাস's blog post "অভিমান"
Jan 16
Moynur Rahman Babul liked Moynur Rahman Babul's blog post এও তো প্রেম
Jan 15
পীযূষ কান্তি দাস commented on ইকবাল হোসেন বাল্মীকি's blog post ক্ষুদে গল্পঃ-১, কিছু সত্যকাণ্ড শুনে লঙ্কাকাণ্ড করিবার ইচ্ছা হয় - ইউ এন ও সমাচারঃ
"বা বা ভালা লাগল"
Jan 15
GAUTAM NATH updated their profile photo
Dec 8, 2017
এস ইসলাম updated their profile photo
Nov 17, 2017
sayeem Mohammad shoab shared their blog post on Facebook
Oct 9, 2017
sayeem Mohammad shoab updated their profile photo
Oct 9, 2017
More…